ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬
বিস্তারিত দেখুন
সময় বাকি: লোডিং...

পার্থিব জীবনেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন সাহাবী

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে এমন কিছু মহান ব্যক্তি ছিলেন, যাঁরা নিজেদের ঈমান, আমল, ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। যদিও বিভিন্ন সময়ে নবী করিম (সা.) একাধিক সাহাবীকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন, তবে বিশেষভাবে এমন দশজন সাহাবী আছেন, যাঁদেরকে তিনি একই মজলিসে একত্রে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই সৌভাগ্যবান দশজনকে “আশারায়ে মুবাশশারাহ” নামে অভিহিত করা হয়। নিচে তাঁদের প্রত্যেকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো— 

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) 

হজরত আবু বকর (রাযিঃ)-এর প্রকৃত নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনে আবি কুহাফা। ‘আবু বকর’ তাঁর কুনিয়াত হলেও তিনি ‘সিদ্দিক’ ও ‘খলিফাতুর রাসুল’ উপাধিতেও সুপরিচিত। ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার কুরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে তাঁর জন্ম। ইসলামের শুরুতে যখন অনেকেই দ্বিধায় ছিলেন, তখন তিনি বিনা সংকোচে ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম কবুল করেন। নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় সাহাবীদের একজন এবং পরবর্তীতে ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মিরাজের ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বিনা প্রশ্নে তা বিশ্বাস করার কারণে নবীজি (সা.) তাঁকে ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং তাবুক যুদ্ধে নিজের সমস্ত সম্পদ দান করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং মসজিদে নববীর পাশে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজার সংলগ্ন স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। 

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)  

হজরত উমর (রাযিঃ) ‘ফারুক’ ও ‘আমিরুল মুমিনিন’ উপাধিতে পরিচিত। ৫৭৭ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার বনু আদি গোত্রে তাঁর জন্ম। প্রথমদিকে তিনি ইসলামের বিরোধিতা করলেও ৩৯ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানরা প্রকাশ্যে ইবাদত করার সাহস পায়। কাবার সামনে প্রকাশ্যে সালাত আদায়ের সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়। ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর দৃঢ় অবস্থানের জন্য নবীজি (সা.) তাঁকে ‘ফারুক’ উপাধি দেন, যার অর্থ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী। আবু বকর (রাযিঃ)-এর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় খলিফা হন এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করেন। ৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে এক আততায়ীর আঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন এবং রাসুল (সা.)-এর পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। 

হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)

হজরত উসমান (রাযিঃ) ‘যিননুরাইন’ (দুই নূরের অধিকারী) নামে প্রসিদ্ধ। তিনি ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে কুরাইশ বংশের উমাইয়া গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা এবং অত্যন্ত দানশীল ও উদার ব্যক্তি। মুসলমানদের পানির সংকট দূর করতে তিনি ‘রুমা’ কূপ ক্রয় করে ওয়াকফ করেন। বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান করেছেন। তাঁর শাসনামলে মসজিদে নববী সম্প্রসারণ করা হয়। ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন এবং জান্নাতুল বাকিতে সমাহিত হন। 

হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) 

হজরত আলী (রাযিঃ) ছিলেন নবীজি (সা.)-এর চাচাতো ভাই এবং পরবর্তীতে তাঁর জামাতা। ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার হাশেমি বংশে তাঁর জন্ম। তিনি অল্প বয়সেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং যুবকদের মধ্যে প্রথম মুসলিম হিসেবে পরিচিত। সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য তিনি বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। খাইবার যুদ্ধের বিজয়ের পর নবীজি (সা.) তাঁকে ‘আসাদুল্লাহ’ বা আল্লাহর সিংহ উপাধি দেন। তিনি ইসলামের চতুর্থ খলিফা ছিলেন এবং জ্ঞান-বিচার ও প্রজ্ঞার জন্য তাঁকে ‘ইলমের দরজা’ বলা হয়। 

হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাঃ) 

৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নেওয়া হজরত তালহা (রাযিঃ) ছিলেন নবীজি (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের একজন। তিনি উহুদসহ বিভিন্ন যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে উহুদ যুদ্ধে নবীজি (সা.)-কে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) 

হযরত যুবাইর (রাযিঃ) ‘হাওয়ারি’ বা রাসুল (সা.)-এর বিশেষ সহচর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণকারীদের প্রাথমিক দলের অন্তর্ভুক্ত। বদরসহ বিভিন্ন যুদ্ধে তাঁর অসীম সাহসিকতা প্রকাশ পায়। দানশীলতা, সততা ও বিশ্বস্ততার জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। ৩৬ হিজরিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। 

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) 

তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। তবে দুনিয়াবিমুখতা ও উদারতার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। নিজের সম্পদ তিনি আল্লাহর পথে ব্যয় করতেন এবং মুসলিম সমাজের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ৩৩ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)  

হজরত সা’দ (রাযিঃ) ছিলেন একজন সাহসী যোদ্ধা এবং ইসলামের অন্যতম প্রথম দিকের মুসলিমদের একজন। বদর ও উহুদ যুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ। পারস্য বিজয়ে তাঁর নেতৃত্ব ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি আল্লাহর পথে প্রথম তীর নিক্ষেপকারী হিসেবেও পরিচিত। ৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন।

হযরত সাঈদ ইবনে যায়িদ (রাযিঃ)

তিনি ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সবসময় সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি শিরক থেকে দূরে ছিলেন। তিনি ছিলেন এমন একজন সাহাবী, যার দোয়া কবুল হতো বলে বর্ণিত আছে। প্রায় ৮০ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।

হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) 

তিনি ‘আমিনুল উম্মাহ’ নামে পরিচিত ছিলেন, যার অর্থ উম্মাহর বিশ্বস্ত ব্যক্তি। সাহাবীদের মধ্যে তাঁর সততা ও দায়িত্বশীলতা ছিল অনন্য। খলিফা উমর (রাযিঃ)-এর সময় প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। উপসংহার আশারায়ে মুবাশশারাহ-এর এই দশজন সাহাবী ইসলামের ইতিহাসে অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁদের জীবন ত্যাগ, ঈমানের দৃঢ়তা, নৈতিকতা ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁদের জীবনী মুসলমানদের জন্য শুধু অনুপ্রেরণাই নয়, বরং সঠিক জীবনপথ অনুসরণের দিকনির্দেশনাও প্রদান করে।